মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

শিরোনাম

ছোট গল্প: ছায়াবীথি তলে

বুধবার, জানুয়ারী ৩, ২০২৪

প্রিন্ট করুন
সুচরিত চৌধুরী

সুচরিত চৌধুরী: পুকুরের পূর্ব পাড়ে এসে দাঁড়াতেই কেমন যেন একটা অনুভূতি হয় সজলের। ১৭ বছর পর আবার এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। এখান থেকে রাস্তাটা সোজা গিয়ে যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেই বাঁকটা ঘুরলেই দেখা যেত বাদাম গাছটা। ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া দিচ্ছে। তখন গাছটা অনেক ছোট ছিল। এখন অনেক বড়। এপার থেকেই দেখতে পাচ্ছে গাছের উঁচু মাথাটা। ওখানেই, ওই গাছটার নীচে হাত পা ছড়িয়ে বসে থাকত মানদা পিসি।

রাস্তার পাশে পুকুর পাড়টা রাস্তা থেকে তিন চার ফুট উঁচু ছিল। বিশেষ করে যেখানে বাঁকটা নিয়েছে, ওখানটায় আরো উঁচু ছিল আর সজল সেই সময় ছিল অনেক ছোট। সম্ভবত সেই কারণেই পুকুর পাড়টাকে মনে হত একটা পাহাড়। আর সে যেন পাহাড়ি পথে হাঁটছে। রাস্তার অন্য দিকে একটা বড়সড় নালা, এখানে বলে ছড়া। পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পানি এই ছড়া দিয়ে চলে যায় আরো পশ্চিমে, যেখানে মন্দোদরী খাল হেলতে দুলতে গিয়ে মিশেছে হালদা নদীতে, হালদা মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। এভাবেই সাগর থেকে মহাসাগরে মিশে যায় এই গ্রামের জল। আটলান্টিকের তীরে বসে মহাসাগরের লোনা জল হাতে নিয়ে সজল এমনটাই ভাবত।

নালার ওপারে ঘন সুপুরি বাগান। এক বার কি একটা প্রাণী এসেছিল সেই বাগানে। পাহাড় থেকেই এসেছিল। গ্রামের লোকজন পিটিয়ে মেরেছিল প্রাণীটাকে। লোকজন বলছিল বাগডাশ। খুব ভয়ঙ্কর প্রাণী। বাঘডাশ কি সজল এখনো চিনে না। তবে, সেই প্রাণীটাকে নেহায়েতই নিরীহ মনে হয়েছে সজলের। হয়ত সম্মিলিত গ্রামবাসীকে দেখে ভয় পেয়েছিল প্রাণীটা। তাই, তার ভয়ঙ্করত্ব দেখানোর কোন চেষ্টাই করেনি। বরং, প্রাণ বাঁচাতে এই গাছ থেকে ওই গাছে লাফিয়ে পড়ছিল। শৈশবের এ ঘটনা সজলের এখনো খুব মনে পড়ে।

সেই শৈশবেই সজলকে নিয়ে কানাডা পাড়ি জমায় সজলের বাবা। মায়েরও যাওয়ার কথা ছিল। সবকিছু যখন ঠিকঠাক, তখন হঠাৎ এক দিন মা মারা যান। এই গ্রামেই। সজলরা শহরে থাকত। বন্ধের ছুটিতে বেড়াতে আসত। সেবারও এসেছিল। গ্রামের বাড়িতে এটাচ টয়লেট রাখার নিয়ম ছিল না তখন। টয়লেট রাখা হত বাড়ির বাইরে। মাঝ রাতে এক বার টয়লেটে যাওয়া মায়ের অভ্যাস ছিল। সে রাতে টয়লেটে যেতে গিয়ে মা হঠাৎ ছোট্ট একটা চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে যান। সবাই ধরাধরি করে ঘরে আনতেই মায়ের নাকমুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। অত রাতে গ্রাম থেকে শহরে আসার কোন সুযোগ ছিল না। আর গ্রামে কোন হাসপাতালও ছিল না। পরের দিন সকালে শহরে নিয়ে আসলে ডাক্তাররা মাকে মৃত ঘোষণা করে। ডাক্তাররা বলেছিলেন, ব্রেইন হেমারেজ। যদিও গ্রামের লোকের বিশ্বাস, মাকে জ্বীন আক্রমণ করেছিল। মায়ের মৃত্যুশোক ভুলতে এত বছর বাবা আর দেশে ফিরেননি।

আজ ১৭ বছর পর সজল দেশে ফিরেছে। বাবাও এসেছেন। মায়ের শোক ভুলে গেছে সজল। তবুও গ্রামে এসে মায়ের চিতার পাশে দাঁড়াতেই বুকের ভিতরটা কেমন হু হু করে উঠে। সকালে গ্রাম দেখতে বের হয় সজল। গ্রামের লোকজন তাকে চিনতে পারে না। কিন্তু, সজল পুরোনো অনেককেই চিনতে পারে। পরিচয় দিয়ে প্রণাম করতেই ওরা সজলকে বুকে জড়িয়ে ধরে। গ্রামের বয়ষ্ক মানুষদের বুকের উত্তাপে সজলের বুকে জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করে। আর সেই বরফ গলা জল দরদর করে বেরিয়ে আসে চোখ দিয়ে।

মানদা পিসি পাগল ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক বীরাঙ্গনা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানী আর্মির ক্যাম্প থেকে যখন মানদা পিসিকে উদ্ধার করা হয়, তখন প্রায় আধপাগল অবস্থা। গ্রামে ফিরে বিধ্বস্ত পোড়া বাড়িতে এসে জানতে পারে, তাকে নিয়ে যাওয়ার পর তার পরিবারের সবাইকে খুন করে বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছিল। সেই শোক মানদা পিসি সহ্য করতে পারে না। এক সময় পুরো পাগল হয়ে যায়।

ওই বাদাম গাছটার নীচে সারা দিন বসে থাকত। খিদে পেলে এই বাড়ি ওই বাড়ি ঘুরে যা পেত, তাই খেত। গ্রামের বাচ্চারা মানদা পিসিকে ভয় পেত। কিন্তু, সজল পেত না। সজলরা গ্রামে এলে সজলের মা, মানদা পিসিকে প্রতিদিন দুবেলা খাওয়াত। তাই, হয়ত মানদা পিসি ওকে কখনও ভয় দেখাত না। কিন্তু, গ্রামের অনেক বাচ্চা, মানদা পিসির ভয়ে একা একা এই রাস্তা দিয়ে হাঁটত না।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পর পর দুইটি সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায় অনেক নতুন নতুন নেতা সৃষ্টি হয় দেশে। এই গ্রামেও নেতা সৃষ্টি হয়েছিল। তেমন এক প্রভাবশালী নেতা অনিল সরকার।

অনিল সরকারের মেয়ে কুসি এক দিন এই রাস্তায় মুখোমুখি হয় মানদা পিসির। মানদা পিসি কি করেছিল জানা নেই, তবে কুসি ভয় পেয়ে দৌড়াতে গিয়ে পড়েছিল একটা ষাঁড়ের মুখে আর ষাঁড়ের শিঙের গুঁতো খেয়ে কুসি গিয়ে পড়ে ছড়ার পানিতে। এই ঘটনায় ক্ষেপে গিয়ে অনিল সরকার দলবল নিয়ে মানদা পিসিকে বেধড়ক পিটুনি দেয় এক গ্রাম মানুষের সামনে। সেই বাঘডাশকে পিটিয়ে মারার সময় গ্রামের মানুষ যেমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছিল, সেই দিনও ঠিক তেমন করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল গ্রামের মানুষ।

শরীরে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে সেই রাতে গ্রামের কালিবাড়ির বারান্দায় শুয়েছিল মানদা পিসি। পর দিন সকাল থেকে আর কেউ মানদা পিসিকে দেখেনি। গ্রামের এত মানুষের সামনে এভাবে পেটানোতে হয়ত মানদা পিসির সম্মানে লেগেছিল। যুদ্ধের ক্ষত ভুলতে না পারা বীরাঙ্গনা মানদা হয়ত তার গ্রামের মানুষের এই আচরণ সহ্য করতে পারেনি।

মৃত্যুশোক ভুলা যায়, শরীরের ব্যাথাও এক সময় চলে যায়, কিন্তু অপমান সহজে ভুলা যায় না।

সজল আর এগুতে পারে না। বাঁকটা ঘুরলেই অনেক বড় হয়ে যাওয়া বাদাম গাছটার নিচে মানদা পিসির জন্য এতটুকু জায়গা নেই। সেটা ভাবতেই সজলের দু’চোখ জলে ভিজে উঠে।

গল্পকার: নাট্যজন, চট্টগ্রাম (ফেসবুক থেকে সংগৃহিত)