রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪

শিরোনাম

দেশের মানুষ আজ খাদ্যে ভেজালের আতঙ্কে

মঙ্গলবার, নভেম্বর ১, ২০২২

প্রিন্ট করুন
মো. গনি মিয়া বাবুল

মো. গনি মিয়া বাবুল: সব সুখের ও সৌন্দর্যের মূল হচ্ছে সুস্বাস্থ্য। সুস্বাস্থ্য ছাড়া জীবনের সব অর্জনেই বৃথা। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ খাদ্য। ইংরেজীতে বলা হয়, হেলদি ফুড, হেলদি লাইফ, অর্থাৎ সুস্থ খাবার, সুস্থ জীবন। যে খাদ্য দেহের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং দেহের বৃদ্ধি, ক্ষয় পূরণ ও রোগ প্রতিরোধ করে, তাই স্বাস্থ্যসম্মত বা নিরাপদ খাদ্য। নিরাপদ খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, দেশের প্রায় সব খাদ্যেই ভেজাল রয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার আজ আমাদের নাগালের বাইরে। দেশের সব মানুষ আজ খাদ্যে ভেজালের আতঙ্কে। খাদ্যে ভেজালের দৌরাত্মে জনজীবন আজ হুমকীর সম্মুখীন।

মহাখালী পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের খাদ্য পরীক্ষাগারের তথ্যানুযায়ী, দেশের ৫৪ ভাগ খাদ্যপণ্য ভেজাল ও দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত হয়। সারা দেশ থেকে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের পাঠানো খাদ্যদ্রব্যাদি পরীক্ষাকালে এ তথ্য বেরিয়ে আসে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন এক গবেষণায় বলছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ, কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ। এ ছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এ পরিসংখ্যানটি আমাদের ভাবিয়ে না তুলে পারে না।

নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তায় ২০১৩ সালে আইন হয়েছে। ২০১৫ সালে গঠন করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ভেজালবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি তারা কাজ করছে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেজালবিরোধী অভিযান তো আছেই। তার পরও কমছে না ভেজালের ব্যাপকতা। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া ও ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪ বছরের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আমরা আশা করব, ভেজালবিরোধী অভিযান কঠোর হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল পণ্য ও অসাধু ব্যবসায়ীদের ঠেকাতে অভিযান নিয়মিত থাকলে ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যায়। তবে ভেজাল ঠেকাতে সচেতনতার বিকল্প নেই। শুধু আইন দিয়ে ভেজাল ঠেকানো সম্ভব নয়। এ জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ২৫ লাখ ক্ষুদ্র বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ী ও ১৮টি মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত। এ ছাড়া দেশে প্রায় ৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা খাদ্যদ্রব্যের সাথে সম্পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের অধীন প্রায় ১২০টি আইন ও নীতিমালা রয়েছে। সর্বস্তরে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যত আইন রয়েছে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সেগুলো কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

৬৪টি জেলায় ও আটটি বিভাগীয় শহরে ৭৪টি নিরাপদ খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন মেনে চলার জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী নানা সংগঠনের সাথে সম্মিলিতভাবে বিধিমালাগুলো প্রণয়নের কাজ অব্যাহত রেখেছে।

নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আবশ্যক। আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে চাষাবাদের জন্য কৃষককে আগ্রহী করতে হবে। এ ছাড়া এক প্রতিষ্ঠানের সাথে অন্য প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ ও সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সচেতনতার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে।

এক গবেষণা সূত্রে জানা যায়, আমাদের শরীরে ৩৩ শতাংশ রোগ হওয়ার পেছনে রয়েছে ভেজাল খাদ্য। পাঁচ বছরের নিচে শিশুর ৪০ ভাগ রোগ হয় দূষিত খাদ্য থেকে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত নানা পর্যায়ে দূষিত হয়। এর মূল কারণ অসচেতনতা।

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে না পারলে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করার কথা চিন্তাও করা যায় না। কৃষিতে ঢালাওভাবে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার হচ্ছে। ফলে শাক-সব্জি ও ফলসহ বিভিন্ন খাদ্যের মাধ্যমে কীটনাশক মানুষের দেহে প্রবেশ করছে, যা শরীরের জন্যে খুবই ক্ষতিকর। এ বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। সরকার কোন কীটনাশক নিষিদ্ধ করেছে, কোনটার অনুমোদন দিয়েছে ও কীটনাশক ব্যবহারের বিধি-বিধান ইত্যাদি বিষয়ে কৃষকদের সর্বশেষ তথ্য জানা আবশ্যক। খাদ্য কৃষক বাজারজাত করার সময় খাদ্য দূষিত করে, ক্রেতা ভাল পণ্যের সাথে ভেজাল পণ্যের মিশ্রণ ঘটিয়ে খাদ্যের দূষণ ঘটায়। এ দূষণ রোধ করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

উৎপাদনের পরিবেশ খাদ্যের মানকে প্রভাবিত করে। বাজারের তাজা মাছ কোন পরিবেশে বড় হয়েছে, সেটি কিন্তু মাছের গুণগত মান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। মাছকে যে খাবার দেয়া হয়, তা থেকেও মানুষের শরীরে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। এ জন্য উৎপাদনের পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর করতে হবে। নতুবা ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যাবে।