মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪

শিরোনাম

মানবাধিকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৮, ২০২২

প্রিন্ট করুন
মো. গনি মিয়া বাবুল

মো. গনি মিয়া বাবুল: মানুষ পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে মানবিক মর্যাদাসহ বেঁচে থাকার জন্যে এবং তার স্বাভাবিক গুণাবলী ও বৃত্তির প্রকাশ ঘটাতে প্রয়োজনীয় অধিকারগুলোকেই বলা হয় মানবাধিকার। মানুষের এ অধিকারগুলো বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই মানবাধিকার ঘোষিত হয়। একে বলা হয়, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। তাই আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দলিল ‘সংবিধান’ এ মানবাধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ফলে মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকার তৈরি করেছে বিভিন্ন আইন। যথা-শিশু অধিকার আইন, বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইন, শিশু ও নারী নির্যাতন রোধ আইন ইত্যাদি। মানবাধিকারের বিশ্বজনীন ঘোষণা সত্ত্বেও প্রায়ই আমাদের মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে। রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের পাতায় আমরা এরকম ঘটনা প্রায়ই শুনি ও দেখি। আমাদের দেশে এ রকম কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল- শিশুশ্রম, নারী ও শিশু পাচার, এসিড নিক্ষেপ, সড়ক দুর্ঘটনা, সাম্প্রদায়িকতা ও যৌতুকের কারণে অত্যাচার ইত্যাদি।

উল্লেখিত মানবাধিকার বিরোধী কাজ সম্পর্কে সকলকে সচেতন হতে হবে ও প্রতিকার করার জন্যে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও গণ মাধ্যমের ভূমিকা ব্যাপক। আইনের প্রয়োগিক প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার নিশ্চিত করার কাজটি যেমন পুলিশ বিভাগকে করতে হচ্ছে, তেমনি এ বিষয়ে জনমত তথা গণসচেতনতা তৈরির দায়িত্ব প্রধানত গণ মাধ্যমের। বাংলাদেশের সংবিধানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এসব সাংবিধানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যেই মূলত পুলিশ ও গণ মাধ্যম তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। রাষ্ট্রের স্বার্থে, সমাজ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করায় মূলত পুলিশ ও গণ মাধ্যমের দায়িত্ব।

মানবাধিকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণে পুলিশ ও গণ মাধ্যমের সমন্বয় আবশ্যক। এতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং জনগণ অধিক সেবা ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। আমরা যদি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখি, তাহলে দেখতে পাব যে, গণতন্ত্র প্রচলিত আছে এ রূপ সব দেশেই পুলিশ ও গণ মাধ্যমগুলোর মধ্যে সৌহাদ্যের সম্পর্ক ও সমন্বয় বিদ্যমান রয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে সেখানের জনগণেরও সু-সম্পর্ক বিরাজমান। ফলে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, আইনের প্রয়োগ ও জনস্বার্থে যে কোন কার্যক্রম পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা পালন করেন। তাই, সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিরাপদ থাকে। পুলিশ ও গণমাধ্যগুলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে দেশ ও জনগণের কল্যাণে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তাদের মধ্যে আরো অধিক সমন্বয় থাকা আবশ্যক। কারণ, সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে অনেক সুবিধাবলী লাভ করা সম্ভব। যথা- রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের অধিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে; জনগণের প্রয়োজনে পুলিশ দ্রুত তাদের সেবা দিতে পারবেন; দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা সুদৃঢ় হবে; মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করা সহজ হবে; পুলিশবাহিনী গণমুখী তথা জনগণের বন্ধু হওয়ার সুযোগ পাবে; নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে কাজ করা সহজ হবে; দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন অর্থাৎ সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

মানবাধিকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণে পুলিশ ও গণ মাধ্যমের কার্যক্রমে সমন্বয় খুবই প্রয়োজন। তবে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি উল্লেখিত প্রতিষ্ঠান দুইটিকে আরো কিছু সাধারণ শর্ত পালন করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যথা- পুলিশ ও গণ মাধ্যমকে সর্বদা দলমতের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে; সর্বদা নিরপেক্ষ ও নির্ভীক থাকতে হবে; সর্বক্ষেত্রে সমঅধিকার, আইনগত অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে; পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কার্যকরভাবে অপরাধ রোধ, উদঘাটন, দমন, সামাজিক শান্তি ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে; পুলিশ বাহিনীর সদস্য ও গণ মাধ্যম কর্মীদের দক্ষ, কর্মনিষ্ঠ ও আধুনিক করে তোলার জন্যে যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; কারো অনভিপ্রেত অন্যায় নির্দেশ বা ক্ষুদ্র স্বার্থ চিন্তা তাকে যেন ক্ষমতা অপব্যবহারে লিপ্ত না করে, তা নিশ্চত করতে হবে; কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে; জনগণের বিশ্বাস কিংবা আস্থা অর্জনে কাজ করতে হবে; নিয়মানুবর্তিতা, সততা ও নিষ্ঠার সাথে স্বীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে; জনগণের চাহিদা মোতাবেক গণমুখী ভূমিকা পালন করতে হবে; জনগণের ডাকে দ্রুত সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে; বিজ্ঞান ভিত্তিক আধুনিক অনুসন্ধান কিংবা তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতির ব্যবহার করতে হবে; দুর্নীতি দমনে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে ও রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে।
 
দেশে সুদৃঢ় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পুলিশ ও গণ মাধ্যমের কার্যক্রমে সমন্বয় থাকা বাঞ্চনীয়। মানবাধিকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণে পুলিশ বাহিনী ও গণ মাধ্যমকে সর্বদা নিরপেক্ষ, সততা ও নিষ্ঠার সাথে স্বীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং সব রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
 
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সব মানুষের সমান অধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছে। এ ঘোষণাপত্রের আলোকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে সংবিধান প্রণীত হয়। এ সংবিধানে সকলের মানবাধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

আমরা জানি, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এ সংবিধান পরিবর্তন করে বৈষম্যমূলক ও সাম্প্রদায়িককরণের মাধ্যমে পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো হয়। সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে বিভিন্নভাবে মদদ দেয়া হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যে ৭৫ পরবর্তী আওয়ামী লীগসহ গণতান্ত্রিক শক্তি ও অন্যান্য সামাজিক শক্তি বস্তবতা ও বিরাজমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জোটবদ্ধভাবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জনগণের রায়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসে সাম্য ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট নির্বাচনে জয় পায়। এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ১৯৭১ সালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের কারণে দোষীদের বিচার কাজ শুরু করে। ইতিমধ্যে মানবতাবিরোধী অনেক অপরাধীর বিচারের রায় হয়েছে ও তা কার্যকর হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড মামলার বিচারের রায় হয়েছে ও অধিকাংশ অপরাধীদের শাস্তি কার্যকর হয়েছে। তবে মানবাধিকর উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সরকার, রাজনৈতিক দল, গণ মাধ্যম, নাগরিক সমাজ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
 
লেখক: শিক্ষক, গবেষক, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক), ঢাকা।