শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪

শিরোনাম

সুইস ব্যাংক থেকে ‘অস্বাভাবিক হারে’ টাকা সরিয়েছেন বাংলাদেশিরা

শুক্রবার, জুন ২১, ২০২৪

প্রিন্ট করুন

সুইজারল্যান্ড: সুইস ব্যাংকে এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত কমেছে ৫৯৭ কোটি টাকা। বৃহস্পতিবার (২০ জুন) সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, সুইস ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশিদের আমানত জমা আছে ২৩৪ কোটি টাকা বা এক কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঁ (প্রতি ফ্রাঁ ১৩২ টাকা)। এ হিসাব ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু ওই বছরের শুরুতে ৭২৯ কোটি টাকা বা পাঁচ কোটি ৫২ লাখ ফ্রাঁ আমানত ছিল। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক বছরে আমানতের হার প্রায় ৬৫ শতাংশ কমেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বাংলাদেশের ডলার সংকট এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। কেউ কেউ পাচার করা টাকাও হয়তো সরিয়ে নিয়েছেন।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) অর্থনীতিদ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে সুইস ব্যাংকের আকর্ষণ কমছে। তথ্য প্রযুক্তির সুবিধার্থে পৃথিবীল বহু দেশের ব্যাংকে নিরাপদে বৈদেশিক মুদ্রা রাখা যাচ্ছে। পাচারকারীরা এখন সুইস ব্যাংকের বিকল্প হিসাবে ইউএসএ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াসহ বহু দেশে অর্থ পাচার করছে। যে কারণে সুইস ব্যাংকে পূর্বের মত আমানত বাড়ছে না।’

২০২১ সালে যেখানে বাংলাদেশি আমানত ছিল ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, ২০২২ সালের শেষে তা কমে এসেছে মাত্র সাড়ে পাঁচ কোটি ফ্রাঁতে। ওই বছর বিস্ময়কর গতিতে সুইস ব্যাংক থেকে সাড়ে দশ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশিরা। টাকা তুলে নেয়ার প্রবণতা ২০২৩ সালেও অব্যাহত ছিল। যা বেশ উল্লেখ করার মত। আমানত কমতে কমতে গেল দুই বছরে ১১ হাজার ২২৯ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করে বাংলাদেশিরা কী করেছে, তার কোন ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে নেই।

পৃথিবরি নানা দেশের হাজার হাজার মানুষ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বৈধ-অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ গচ্ছিত রাখেন। কঠোর গোপনীয় ব্যাংকিং নীতির কারণে পুরো পৃথিবীর মানুষ সেখানে অর্থ জমা রাখেন। বিশেষ করে অবৈধ আয় আর কর ফাঁকি দিয়ে জমানো টাকা জমা রাখা হয় সুইস ব্যাংকে। নির্দিষ্ট গ্রাহকের তথ্য না দিলেও এক দশক ধরে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক।

আমানত কমে যাওয়ার পেছনে ধারণা করা হচ্ছে, সুইজারল্যান্ডে গোপনীয়তা কমতে থাকায় বাংলাদেশিসহ বহু দেশের ধনী ব্যক্তিই এখন অবৈধ টাকা জমা রাখার জন্য লুক্সেমবার্গ, কেম্যান আইল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড বা বারমুডার মত ট্যাক্স হ্যাভেন দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।

প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ তার পূর্বের বছরের তুলনায় কম ছিল। ওই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পাঁচ হাজার ২০৩ কোটি টাকার বেশি। এর পূর্বের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্রাঁ। ২০১৮ সালে এ অর্থের পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি সুইস ফ্রাঁ। আর ২০১৭ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ।

এ দিকে, বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের সুইস ব্যাংকে অর্থ আমানতের হার ২০২৩ সালে প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। গেল চার বছরের মধ্যে ভারতীয়দের আমানতের পরিমাণ সর্বনিম্নে পৌঁছেছে ২০২৩ সালে।

আমানত হ্রাস পাওয়ার পরও সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের অর্থের পরিমাণ এক দশমিক ০৪ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে দাঁড়িয়েছে; যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় নয় হাজার ৭৭১ কোটি রুপি। এ নিয়ে সুইস ব্যাংকে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের আমানত টানা দ্বিতীয় বারের মত কমেছে।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের ‘মোট দায়ের’ মধ্যে ব্যক্তিগত, ব্যাংক ও অন্যান্য উদ্যোগের আমানতসহ সব ধরনের তহবিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।