রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪

শিরোনাম

সোলেইমানির স্মরণ সভায় বিস্ফোরণের জন্য দায়ী ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ৪, ২০২৪

প্রিন্ট করুন

তেহরান, ইরান: ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রয়াত জেনারেল কাসেম সোলেইমানির স্মরণ অনুষ্ঠানে ভয়াবহ জোড়া বোমা বিস্ফোরণের জন্য বুধবার (৩ জানুয়ারি) ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে তেহরান। চার বছর পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হয়েছিল। দেশটির দক্ষিণে এই বোমা বিস্ফোরণে অন্তত ৯৫ জন নিহত হয়েছে।

গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ এবং মঙ্গলবার (২ জানুয়ারি) লেবাননে হামাসের একজন সিনিয়র নেতার হত্যা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার মধ্যে এই কেরমানে জোড়া বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ও আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে।

কেউ হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে এই হামলা এই অঞ্চলে একটি বিস্তৃত সংঘাতের আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। এটি বিশ্ববাজারে ঝাঁকুনি দিয়েছে, যেখানে তেলের দাম তিন শতাংশের বেশি বেড়েছে ও বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ডেপুটি মোহাম্মদ জামশিদি এক্সে লিখেছেন, ‘ওয়াশিংটন বলেছে, ইরানের কেরমানে সন্ত্রাসী হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোন ভূমিকা ছিল না। সত্যিই? একটি শেয়াল প্রথমে নিজের আস্তানার গন্ধ পায়।’

তিনি বলেন, ‘কোন ভুল করবেন না। এই অপরাধের দায়ভার যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী শাসকদের (ইসরায়েল) ও সন্ত্রাসবাদ শুধুমাত্র তাদের একটি হাতিয়ার।’

যুক্তরাষ্ট্র এর পূর্বে কোন ঘটনায় তার মিত্র ইসরায়েলের জড়িত থাকার অভিযোগ স্বীকার করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কোনভাবেই জড়িত ছিল না, আমাদের বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই যে, এই বিস্ফোরণে ইসরায়েল জড়িত ছিল।’

বিস্ফোরণের ব্যাপারে জানতে চাইলে, ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি বলেছেন, ‘আমরা হামাসের সাথে যুদ্ধের দিকে মনোনিবেশ করছি।’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হামলার জন্য দেশের ‘দুষ্ট ও অপরাধী শত্রুদের’ দায়ী করেছেন ও ‘কঠোর উত্তর’ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এই জঘন্য হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বৃহস্পতিবার (৪ জানুয়ারি) তুরস্ক সফর বাতিল করেছেন ও ইরান বৃহস্পতিবার জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেছে।

প্রায় ১৫ মিনিটের ব্যবধানে এই বিস্ফোরণগুলো ঘটে। সোলেইমানির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কেরমানে সাহেব আল-জামান মসজিদের শহীদ কবরস্থানের কাছে এই বোমা হামলা চালানো হয়। এই সময় সমর্থকরা বাগদাদে ২০২০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত সোলেইমানির স্মরণ অনুষ্ঠানে জড়ো হয়েছিল।

ইরানের সরকারি সংস্থা বার্তা সংস্থা ‘ইরনা’ জানায়, প্রাথমিকভাবে ১০৩ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বলেছে ‘২১১ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রী বাহরাম ইনোল্লাহি পরে নিহতের সংখ্যা সংশোধন করে বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী ঘটনায় নিহতের সঠিক সংখ্যা ৯৫।’

তিনি বলেন, ‘কিছু নাম ‘ভুলবশত দুই বার নিবন্ধিত হয়েছিল’ বলে পূর্বের সংখ্যা ১০৩ উল্লেখ করা হয়েছিল।’

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, প্রথম বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে ছুটে আসা তিন জন প্যারামেডিক নিহতদের মধ্যে রয়েছেন।

ইরনা বলেছে, ‘প্রথম বিস্ফোরণটি সোলেইমানির কবর থেকে প্রায় ৭০০ মিটার দূরে ঘটেছিল ও অন্যটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিল।

‘তাসনিম’ বার্তা সংস্থা, এটিকে ওয়াকিবহাল সূত্র বলে উদ্ধৃত করে বলেছে, ‘বোমা বহনকারী দুটি ব্যাগ ফেটে গেছে’ ও ‘দুষ্কৃতকারীরা স্পষ্টতই রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।’

অনলাইন ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, আতঙ্কিত জনতা পালানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কারণ, নিরাপত্তা কর্মীরা এলাকাটি ঘিরে রেখেছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে রক্তাক্ত লোকদের মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে ও তাদের সাহায্যের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকর্মীরা দৌড়ে ঘটনাস্থলের দিকে যাচ্ছে।

একজন প্রত্যক্ষদর্শীর উদ্ধৃতি দিয়ে ‘আইএসএনএ’ নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ‘আমরা যখন কবরস্থানের দিকে হাঁটছিলাম, তখন হঠাৎ একটি গাড়ি আমাদের পিছনে থামে ও একটি বোমা আবর্জনা ফেলার জায়গায় বিস্ফোরিত হয়।’

‘আমরা শুধুমাত্র বিস্ফোরণ শুনেছি ও লোকজনকে পড়ে থাকতে দেখেছি।’

রাত নাগাদ, জনতা কেরমানে শহীদ কবরস্থানে ফিরে আসে। তারা ‘ইসরায়েলের ধ্বংস’ ও ‘আমেরিকার ধ্বংস’ হোক বলে শ্লোগান দেয়।

ইরানের রাজধানী তেহরানে হাজার হাজার মানুষ সোলেইমানিকে শ্রদ্ধা জানাতে গ্রান্ড মোসাল্লা মসজিদে জড়ো হয়েছিল।

সোলেইমানির মেয়ে জেইনাব বলেছেন, ‘আমরা আজকের হিংস্র সন্ত্রাসী ঘটনার নিন্দা জানাই। আমি আশা করি, অপরাধীদের চিহ্নিত করা হবে ও তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দেয়া হবে।’

সোলেইমানি মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সামরিক অভিযানের তত্ত্বাবধানে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিদেশী অপারেশন শাখা কুদস ফোর্সের নেতৃত্ব দেন।

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সৌদি আরব, জর্ডান, জার্মানি এবং ইরাকসহ বেশ কয়েকটি দেশ বিস্ফোরণের নিন্দা জানিয়েছে।
জাতিসংঘ প্রধান আন্তোনিও গুতেরেস বিস্ফোরণের ‘কঠোর নিন্দা’ করেছেন। জাতিসংঘের কার্যালয় এ তথ্য জানায়।

ইইউ বলেছে, ‘এই সন্ত্রাসী হামলায় অনেক বেসামরিক লোকের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক।’

ইইউর শীর্ষ কূটনীতিক জোসেপ বোরেল বলেছেন, ‘তিনি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দুল্লাহিয়ানের সাথে ‘সমবেদনা জানাতে’ কথা বলেছেন ও কঠোর ভাষায় ‘এই সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা করেছেন এবং ইরানি জনগণের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন।’

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রেসিডেন্ট রাইসি ও খামেনিকে লিখেছেন ‘কবরস্থানে আসা শান্তিপূর্ণ লোকদের হত্যার নিষ্ঠুরতায় তিনি মর্মাহত।’

ইরানের মিত্র হামাস ‘অপরাধী হামলার’ নিন্দা করেছে, যখন রিয়াদে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘এই বেদনাদায়ক ঘটনায় ইরানের সাথে সংহতি’ প্রকাশ করেছে।