যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা বেশিরভাগ পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ ন্যূনতম শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর উচ্চতর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর প্রভাবে এরইমধ্যে দেশে দেশে শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে, অস্থিরতা দেখা দিয়েছে স্বর্ণের বাজারে। ট্রাম্পের এই রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে বিশ্বজুড়ে। শুল্কারোপের এই প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও; এতে শঙ্কায় রফতানিকারক ও শিল্প উদ্যোক্তারা।
ট্রাম্প আগেই জানিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) হবে অ্যামেরিকার লিবারেশন ডে বা মুক্তি দিবস। কারণ, তিনি বিশ্বের অন্য দেশের উপরে সমহারে শুল্ক বসাবেন। অন্য দেশ যে হারে মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক বসায়, ঠিক ততটা শুল্ক তাদের ওপর বসানো হবে। তবে এদিন বিভিন্ন দেশের উপর শুল্ক বসানোর ঘোষণা করে ট্রাম্প জানিয়েছেন, অন্য দেশের তুলনায় অর্ধেক বা তার কমবেশি শুল্ক বসানো হয়েছে। আগামী ৫ এপ্রিল থেকে এই শুল্ক কার্যকর হবে।
ট্রাম্প বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে আমাদের দেশকে দূরের ও কাছের বন্ধু ও শত্রু নির্বিশেষে বিভিন্ন দেশ লুণ্ঠন করেছে, ধর্ষণ করেছে এবং ধ্বংস করেছে। বিদেশি মেথররা আমাদের এক সময়ের সুন্দর আমেরিকান স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। আজকের দিনকে আমেরিকান শিল্পের ‘পুনর্জন্ম’ এবং আমেরিকাকে ‘আবার সম্পদশালী’ করার দিন হিসেবে স্মরণ করা হবে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কখনো কখনো ‘বন্ধু শত্রুর চেয়েও খারাপ হয়’।’
এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তা কার্যকর করা হবে আগামী ৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে। আর যেসব দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশের বেশি শুল্ক ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প, সেই নতুন শুল্ক কার্যকর হবে আগামী ৯ এপ্রিল মার্কিন স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে।
এশিয়ার কোন দেশের ওপর কত শুল্ক আরোপ করলেন ট্রাম্প?
এশিয়ায় বাংলাদেশ বাদেও ভারতের পণ্যের ওপর ২৬, পাকিস্তান ২৯, চীনা পণ্যে ৩৪, শ্রীলঙ্কা ৪৪, মিয়ানমার ৪৪, ভিয়েতনামের পণ্যে ৪৬ শতাংশ শুল্কারোপ করেন ট্রাম্প। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সবচেয়ে বেশি কম্বোডিয়ার পণ্যে শুল্কারোপ করেছেন তিনি।
চীন – ৩৪ শতাংশ
ভিয়েতনাম – ৪৬ শতাংশ
তাইওয়ান – ৩২ শতাংশ
জাপান – ২৪ শতাংশ
ভারত – ২৬ শতাংশ
দক্ষিণ কোরিয়া – ২৫ শতাংশ
থাইল্যান্ড – ৩৬ শতাংশ
মালয়েশিয়া – ২৪ শতাংশ
কম্বোডিয়া – ৪৯ শতাংশ
বাংলাদেশ – ৩৭ শতাংশ
সিঙ্গাপুর – ১০ শতাংশ
ফিলিপাইন – ১৭ শতাংশ
পাকিস্তান – ২৯ শতাংশ
শ্রীলঙ্কা – ৪৪ শতাংশ
মায়ানমার – ৪৪ শতাংশ
লাওস – ৪৮ শতাংশ
এশিয়া ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে মিত্র হিসেবে পরিচিত ইসরাইলের পণ্যেও রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করেন ট্রাম্প। বাদ যায় নি আফ্রিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের দেশও। শুল্কারোপের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেখুন এখানে।
রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কী:
রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক হলো এমন একটি কর বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা যা এক দেশ অন্য দেশের ওপর একই ধরণের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় আরোপ করে। পারস্পরিক শুল্কের পেছনে ধারণা হলো দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
যদি একটি দেশ অন্য দেশ থেকে পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি প্রথম দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর নিজস্ব শুল্ক আরোপ করে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এই প্রতিক্রিয়া স্থানীয় ব্যবসাগুলিকে রক্ষা করা, চাকরি সংরক্ষণ করা এবং বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা দূর করার জন্য।
রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে:
পারস্পরিক শুল্ক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাধা বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে, যার ফলে বাণিজ্য যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে, যা উভয় অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতি সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত করতে পারে, ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়াতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর করে দিতে পারে।
ট্রাম্পের শুল্কারোপের প্রভাব এরইমধ্যে বিশ্ববাজারে পড়তে শুরু করেছে। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের ঘোষণায় দেশে দেশে শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশের শেয়ারবাজার ধাক্কা খেয়েছে বড়সড়।
শুল্কারোপের পর বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার সূচক দ্রুত নামতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার সূচক নাসডাক ফিউচার্সের পতন হয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রযুক্তি খাতের বড় ৭টি প্রতিষ্ঠানের বাজার মূলধন কমেছে ৭৬০ বিলিয়ন বা ৭৬ হাজার কোটি ডলার। অ্যাপলের আইফোনের সিংহভাগ উৎপাদিত হয় চীনে। অ্যাপলের শেয়ারের দাম কমেছে৭ শতাংশ।
এছাড়া ট্রাম্পের ঘোষণার জেরে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার্স কমেছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, এফটিএসই ফিউচার্স কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, ইউরোপিয়ান ফিউচার্স কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। টোকিওর নিক্কেই (টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জের স্টক মার্কেট সূচক) প্রাথমিকভাবে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমে যায়।
অস্থিরতা দেখা দিয়েছে স্বর্ণের বিশ্ববাজারেও। ট্রাম্পের শুল্কারোপের পর লাফিয়ে বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায় মূল্যবান এই ধাতুটির দাম। বেড়ে প্রতি আউন্স উঠে যায় ৩ হাজার ১৬৭ ডলারে। তবে এরপরই বড় পতন দেখে স্বর্ণের বাজার।
রেকর্ড দাম স্পর্শ করার পর পরই বড় দরপতনের মধ্যে পড়ে একদিনেই প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৭০ ডলারের ওপর কমে গেছে। স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্সে ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯০ ডলারে।
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক বাংলাদেশের জন্য কতটা উদ্বেগের:
মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রফতানিতে একলাফে ২২ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ শুল্কারোপ করায় বড় ধরনের রফতানি বিপর্যয়ের শঙ্কা করছেন রফতানিকারকরা। মূলত বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি এবং দেশটিতে রফতানির পরিমাণ বিবেচনায় এনে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দফতরের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করেছে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। এই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ৬১৫ কোটি ডলার।
এদিকে, উচ্চমাত্রার এই শুল্ক রোষাণলে বাংলাদেশি পণ্য রফতানি, বিশেষ করে চাপে পড়বে তৈরি পোশাক খাত। কারণ, বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রফতানির দ্বিতীয় শীর্ষ গন্তব্য মার্কিন বাজার। যার পরিমাণ ১৮ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, শুল্ক রোষাণলের প্রাথমিক ঝড়ে কতগুলো প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়বে, কতগুলো টিকে থাকবে; তা নির্ভর করবে সরকারের নীতি সহায়তার ওপর। কিছু হবে না ভেবে সরকার বসে থাকলে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে পোশাক খাত।
লাভবান হবে ভারত-চীন:
নতুন শুল্কযুদ্ধে, মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারতে ২৬, চীনে ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এতে যেমন বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তেমনি ভারত পাবে বিশেষ সুবিধা।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাক রফতানিতে এখন আগের চেয়ে বেশি সুবিধা পাবে ভারত। কারণ, দেশটির ওপর বাংলাদেশের চেয়ে কম শুল্কারোপ করেছেন ট্রাম্প।
বাংলাদেশের করণীয়:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় কম। তবে রফতানি হয় বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেশি। বাংলাদেশ বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি যদি কমে তাহলে সামনে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক–কর কমতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র যে শুল্ক আরোপ করেছে, তা কমাতে হলে বাংলাদেশের আমদানি বাড়াতে হবে। তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এটি পর্যালোচনা করবে কি না, তা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দ্রুত শুল্কের বিষয়ে আলোচনায় যেতে হবে। শুধু আলোচনায় গেলেই হবে না, তাদেরকে আগের নিয়ম বা সম্ভব হলে শুল্ক আরও কমানো যায় কিনা তা নিয়ে রাজি করাতে হবে। পাশাপাশি খুঁজতে হবে বিকল্প বাজারও।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব বলেন, আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। তাদের আগের পর্যায়ে শুল্ক রাখার প্রস্তাব দিয়ে আমাদের শুল্ক হার পর্যালোচনা করতে হবে। এ বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করতে হবে, যাতে দুই দেশের পণ্য বিনিময় স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে আরোপ করা শুল্ক কমানো ও টিকফা চুক্তি সামনে রেখে সরকারকে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টিকফা চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির আলোকেই বাংলাদেশকে অগ্রসর হতে হবে। দ্রুত মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করতে হবে। তবে ট্রাম্প নিজে চুক্তিতে স্বাক্ষর করায় সরাসরি হোয়াইট হাউজের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলে সেটি বেশি ফলপ্রসূ হবে।
‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ইস্যুর ইতিবাচক সমাধান হবে’
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ইস্যু সমাধানে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, ‘আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। যেহেতু এটি আলোচনাযোগ্য, তাই আমরা আলোচনা করব এবং আমি নিশ্চিত যে আমরা সর্বোত্তম সমাধানে পৌঁছাতে পারব।’